
কুমিল্লা–১০ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সম্ভাব্য তালিকায় সাবেক এমপি আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় স্থানীয় নেতা–কর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১২ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছেন, একই সাথে নিজ দলের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, যা বিএনপির পরাজয়ে ভূমিকা রাখেছে।
২০০৭ সালে মঈনুদ্দিন-ফখ্রুদ্দিনের সময়ে মাইনাস–টু ফর্মুলায় জড়িত ছিলেন তিনি। হজ্জের যাত্রীদের পর্যন্ত ছাড় দেননি তিনি। ২০০৩ সালে ১৫০ হজযাত্রীর টাকা আত্মসাত করেছেন।
এমন অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সম্ভাব্য তালিকায় চলে আসায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
স্থানীয় বিএনপি নেতা–কর্মীরা বলেন, গত ১৭ বছর দলের আন্দোলন–সংগ্রামে সামনের সারির ভূমিকা রাখা, শতাধিক মামলার ঝুঁকি নিয়ে সংগঠনের প্রতি অনুগত থাকা এবং তৃণমূলে বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া মনোনয়ন পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্যব্যক্তি ছিলেন। দলের সিদান্ত পুনঃবিবেচনা করে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার জোরালো দাবি জানান তারা।
মনোনয়ন তালিকায় জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার নাম না থাকায় তৃণমূলে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। হতাশ নেতা-কর্মীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ও ঢাকা-নোয়াখালী মহসড়ক আবরোধ করে বিক্ষোভ করে বুধবার। এর আগের দিন মঙ্গলবার লালমাই উপজেলায় মশাল মিছিল বের করে তারা। মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মনোনয়নের দাবিতে প্রতিদিনই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
সম্প্রতি আব্দুল গফুর ভূঁইয়া সরকারি উচ্চ-পদস্থ কর্মকার্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে “কলিজা চিড়ে খেয়ে ফেলার” হুমকি দেন।
তার পছন্দমত একটি স্কুলের সভাপতি না দেওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসক এবং শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানকে হুমকি দিলে অডিও–ভিডিও ভাইরাল হয়। এতে কুমিল্লা জেলা বিএনপি তাকে শোকজ করলেও, সেই শোকজের জবাব এখনো কেউ জানে না। এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধে তাকে দল থেকে বহিষ্কার না করে উল্টো মনোনয়ন তালিকায় রাখা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল কর্মীরা।
বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “২০০৮ সালে গফুর ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের আহম মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)-এর হয়ে কাজ করেছেন। তিনি সেই সময় নেতা–কর্মীদের আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের নির্দেশে আমরা বিষয়টি তদন্ত করে এর প্রমাণ পাই।”
মনিরুল হক চৌধুরী, যার নাম বর্তমানে কুমিল্লা–৬ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছে, আরও বলেন—“২০০৮ সালে বিএনপি চেয়ারপার্সন নাঙ্গলকোট জনসভায় যোগ দেন। সে সময় খোদ খালেদা জিয়ার সাথে চরম উদ্যত আচরণ করেন তিনি। চেয়ারপার্সন নিজে তাকে ১৩ বার ফোন করেছিলেন, কিন্তু গফুর ভূঁইয়া একবারও ফোন ধরেননি এবং জনসভায় যোগ দিতে যাননি।”
গফুর ভূঁইয়ার অপকর্মঃ
২০০১ সালে প্রথমবার আব্দুল গফুর ভূঁইয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নানা ধরনের চরম দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। ১২ জনকে খুনের অভিযোগেও তিনি একসময় ব্যাপক আলোচিত ছিলেন।
তার অস্ত্রের গুলিতে ২০০৬ সালে নিহত হন নাঙ্গলকোট উপজেলা শিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান। এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে ফরিদ এবং ২০০২ সালে ইউনুসকে হত্যা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০২ সালে তার মালিকানাধীন সুরমা ইন্টারন্যাশনালের নিম্নমানের কাজের কারণে ঢাকার সায়েন্সল্যাব ও মার্কিন দূতাবাস সংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজ ধসে মাগুরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ একজন পথচারী নিহত হন।
এই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে গফুর ভূঁইয়া পার পেয়ে যান বলে স্থানীয়দের দাবি। কুমিল্লায় গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দুইজন হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পবিত্র হজ্ব কেলেঙ্কারি
২০০৩ সালে প্রায় ১৫০ হজযাত্রীর টাকা আত্মসাতে জড়িয়ে পড়ে বিএনপি সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। পরে তৎকালীন বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন নিজ দায়িত্বে সেই সব হাজিদের হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাদের ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—মনোনয়ন তালিকায় এমন বিতর্কিত নাম দেখে তিনিও হতাশ।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৬২৯ ভোট পান তিনিঃ
হত্যা, দুর্নীতি, সংস্কার, ১/১১ এর কুশীলব সহ নানা বিতর্কের কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৬২৯ ভোট পান এবং তা জামানত বাজেয়াপ্রাপ্ত হয়। একজন সদ্য বিদায়ী এমপি হয়েও এমন লজ্জাজনক ঘটনা নজিরবিহীন।
স্থানীয় বিএনপির অভিযোগ, সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন, যার ফলে অল্প ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া পরাজিত হন। নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নজির আহমেদ ভূঁইয়া পাঁচ মাস আগে এক বর্ধিত সভায় গফুর ভূঁইয়াকে জনসমক্ষে বলেন, “আপনি তো আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন। আপনি লোটাস কামালকে ভোট দিয়েছেন।” ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, গফুর ভূঁইয়া কোনো উত্তর দেননি।
বিষয়ে নজির আহমেদ ভূঁইয়া বলেন– “আমরা আবাক হয়েছি মনোনয়ন তালিকায় গফুর ভূঁইয়ার নাম দেখে। আওয়ামীলীগের দালালী করে কেউ যদি বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।”
১৭ বছর আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায়ঃ
গত ১৭ বছর ধরে তিনি লোটাস কামালের ঘনিষ্ঠতা থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দলের ক্রান্তিকালে আন্দোলন–সংগ্রামের সময় তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করতেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তারা আরো বলেন গফুর ভূঁইয়া সবসময় সুবিধাবাধী। দলের জন্য তিনি কখনো ত্যাগ স্বীকার করেননি বরং সব সময় দলের জন্য সংকট সৃষ্টি করেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর তিনি এলাকায় ব্যাপক বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং সন্ত্রাসী–চাঁদাবাজি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, হাইওয়ে—বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে তার ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
এমনকি স্কুল–কলেজের কমিটিগুলোতেও তার প্রভাব বিস্তার বাড়তে থাকে। নাঙ্গলকোটের ভোলাইন বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে অধ্যাপক ড. শামসুদ্দিন শিশিরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন অধ্যাপক। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে গফুর ভূঁইয়ার পছন্দমতো সভাপতি না করায় তিনি শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানকে মোবাইলে হত্যার হুমকি দেন এবং জেলা প্রশাসককে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন। যা অডিও–ভিডিও ভাইরাল হলে তাকে শোকজ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই শোকজের জবাব দিয়েছেন কিনা তার তথ্য ও কারো কাছে নেই।
লালমাই উপজেলার হুসনে আরা বেগম বলেন—“লোকটার হাত রক্তে রঞ্জিত। সন্ত্রাস–চাঁদাবাজি—এমন অভিযোগ নাই যে তিনি করেন নাই। তার নাম দেখে আমরা হতাশ।”
মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার নাম তালিকায় নেই—তৃণমূলে বিস্ফোরণ ঘটানো ক্ষোভঃ
কুমিল্লা–১০ আসনের সম্ভাব্য মনোনয়ন তালিকায় জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার নাম না থাকায় তৃণমূলে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বিওএনপির সমর্থকরা ক্ষোভ-প্রকাশ করে বলেন সরাসরি খুন, দুর্ণীতির, চাঁদাবাজি, আওয়ামী দালাল ও আওয়ামী পুনঃবাসনকারী, শোকজপ্রাপ্ত একজনের নাম মনোয়ন তালিকায় থাকলেও বঞ্ছিত হয়েছেন ত্যাগী নেতা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া।
গত ১৭ বছর ধরে দলের প্রতিটি আন্দোলন–সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, প্রায় শতাধিক মামলার আসামি হয়ে বারবার কারাবরণ, জেল জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়ে দল ছাড়েননি—এমন এক নেতার নাম মনোনয়ন তালিকায় না থাকাকে স্থানীয় নেতা–কর্মীরা এক ধরনের অবমূল্যায়ন হিসেবেই দেখছেন। লালমাই উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাবের আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একজন ত্যাগী নেতার প্রতি এটি চরম অবমূল্যায়ন। দলের দুর্দিনে মোবাশ্বের ভূঁইয়া ছিলেন কুমিল্লা–১০ আসনের সবচেয়ে সক্রিয় ও সংগঠক নেতা। হরতাল, অবরোধ, প্রতিবাদ সমাবেশ—সবক্ষেত্রেই তিনি কর্মীদের নিয়ে রাস্তায় নেমে নেতৃত্ব দিয়েছেন।”
“রাজনৈতিকভাবে হয়রানিমূলক মামলায় তিনি শতাধিক মামলার আসামি হন এবং দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তবুও কোনোদিন দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি; বরং মামলা ও গ্রেপ্তারের চাপের মধ্যেও নিয়মিত তৃণমূল কর্মীদের পাশে থেকেছেন এবং আন্দোলনকে সক্রিয় রেখেছেন,” বলেন যুব দলের এই সভাপতি।
যুব দলের নাঙ্গলকোট উপজেলার সভাপতি মনিরুক হক বলেন , “দলের কঠিন সময়গুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যেও ছিলেন তিনি। রাজধানীর কাকরাইলস্থ তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘জমজম ট্রেড সেন্টারে’ ডিবির হারুন একাধিকবার হানা দেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের আন্দোলনের সময় তার এই ব্যবসা প্রতিষ্টান থেকে দুই শতাধিক বিএনপি নেতা–কর্মীকে আটক করা হয়। ওই সময় মোবাশ্বের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও মামলা হয়, কিন্তু তবুও তিনি কর্মীদের ছেড়ে যাননি এবং দলীয় অবস্থানে অনড় ছিলেন।”
স্থানীয় বিএনপি নেতা–কর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, “যে মানুষ প্রতিটি আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কর্মীদের আগলে রেখেছেন, দলীয় স্বার্থে নিজের পরিবার–ব্যবসা সবকিছু বিপন্ন করেছেন—সেই ত্যাগী নেতাকে বাদ দেওয়া হচ্ছে কাদের স্বার্থে?”
তারা আরও বলেন, “মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মতো ত্যাগী নেতাকে মনোনয়ন না দিলে রাজনীতি থেকে ত্যাগী মানুষ হারিয়ে যাবে, কারণ ত্যাগীরা যদি মূল্য না পায়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউই আর দলীয় সংগ্রামে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইবে না।”
মোবাশ্বের ভূঁইয়ার ব্যাপারে এমন ক্ষোভ ও হতাশা কুমিল্লা–১০ আসনের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্তও দলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, মাঠের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং দলের দুর্দিনে যারা বুক পেতে দিয়েছে—মনোনয়ন বাছাইয়ে তাদেরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ছিল। অথচ এই তালিকায় মোবাশ্বের ভূঁইয়ার অনুপস্থিতি তৃণমূলের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।







