বিশ্বব্যাপী শুল্ক লড়াই,বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

অনলাইন ডেক্স: বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে শুল্ক নিয়ে চলমান লড়াই বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। তবে এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীন এবং মেক্সিকোর মধ্যে শুল্কারোপ ও পাল্টা শুল্কারোপের ফলে বিশ্ববাণিজ্য কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কানাডার পণ্যের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপের পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে কানাডা সরকার। ধারণা করা হচ্ছে, মেক্সিকো ও চীনও একই পথে হাঁটতে পারে। তবে মৌলিক চাহিদার পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের রপ্তানি ও এফডিআই প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি কমতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসন বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫%। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, যেখানে পোশাক খাত থেকে ২০-২২% রপ্তানি আয় আসে।

যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের অংশ ২১%, যেখানে বাংলাদেশের অংশ ৯% এর কিছু বেশি। ওটেক্সার (OTEXA) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১০ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে চীনের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম, আর তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিজিএমইএর সহায়ক কমিটির সদস্য ও ঊর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ মনে করেন, শুল্ক লড়াইয়ের কারণে ক্রেতারা বিকল্প দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকবে। তবে তিনি সতর্ক করেন, নীতিগত জটিলতা এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এর ফলে সুবিধা প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারতের দিকে চলে যেতে পারে।

বিটিএমএর পরিচালক ও লিটিল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম মনে করেন, কম শুল্ক সুবিধার কারণে বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় বাজারে সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি, চীন ও মেক্সিকোর উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যে গড়ে ১৫.৫% শুল্কারোপ রয়েছে। এই হার চীনের তুলনায় কম হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে।বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা – আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) কার্যকর করা।পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।

নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা – আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তন যেন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত না করে।

শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি – কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া।

বিশ্বব্যাপী শুল্ক লড়াই বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে, সঠিক কৌশল গ্রহণ করা না গেলে এই সম্ভাবনা হাতছাড়া হতে পারে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কি বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *